কীভাবে শনাক্ত করা হয় করোনাভাইরাস আছে কি নেই

কোভিড-১৯ নামক মহামারির যা করোনাভাইরাস নামে পরিচিত।

উপসর্গ গুলো

(রোগের) উপসর্গ বুঝতে দেখা দেয়ার ১ থেকে ১৪ দিন আগে থেকেই কোনও ব্যক্তি এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যেতে পারেন। করোনা ভাইরাস রোগের (COVID-19) সবথেকে সাধারণ উপসর্গগুলি হল জ্বর, ক্লান্তিভাব এবং শুকনো কাশি। বিশেষ চিকিৎসা না করিয়েও বেশির ভাগ মানুষ (প্রায় ৮০%) সুস্থ হয়ে যেতে পারেন।
কম ক্ষেত্রেই এই অসুখ গুরুতর কিংবা মারাত্মক হতে পারে। বয়স্ক ব্যক্তিরা এবং অন্যান্য রোগে (যেমন, হাঁপানি, ডায়াবেটিস, বা হৃদরোগ) আক্রান্ত ব্যক্তিদের করোনা ভাইরাস রোগে আরও মারাত্মকভাবে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে।
আক্রান্ত ব্যক্তিদের এই সমস্যাগুলি হতে পারে:

  1. কাশি
  2. জ্বর
  3. ক্লান্তি
  4. শ্বাসকষ্ট (জটিল অবস্থা)

কীভাবে শনাক্ত করা হয় করোনাভাইরাস আছে কি নেই

ভাইরাসটির প্রতিকার সম্পর্কে বিশেসঙ্গরা বলছেন মানুষের সঙ্গে মানুষের মেলামেশা কমালে এই সংক্রমণ অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।

কোভিড-১৯ পজিটিভ কি না?, তা নির্ণয়ের সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত ও সংবেদনশীল পদ্ধতি হচ্ছে RT-PCR বা রিভার্স ট্রান্সক্রিপ্টেজ পিসিআর।
এই পদ্ধতিতে আমাদের কোষের মধ্যে থাকা আরএনএকে ডিএনএতে পরিণত করে তাকে বহুগুণ বাড়িয়ে তা মেশিনের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ ও গণনা করা যায়। 
আমাদের ডিএনএ মাত্র চারটি অক্ষর দিয়ে লিখিত। 
<>অ্যাডিনোসিন (এ), 
<>সাইটোসিন (সি), 
<>থাইমিন (টি), 
<>গুয়ানিন (জি)
—এই চারটি ক্ষারীয় যৌগের বিভিন্ন রকম বিন্যাস নির্ধারণ করে দেয় কোন জিনের কী কাজ। এই ডিএনএ থেকে আরএনএ তৈরি হয় এবং আরএনএ থেকে তৈরি হয় প্রোটিন, যা আমাদের দেহের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের বহিঃপ্রকাশের জন্য দায়ী। 
যেমন চোখের রং কালো না নীল—এই ধরনের বৈশিষ্ট্যগুলোর ভিন্নতার জন্য দায়ী হচ্ছে ডিএনএর ক্রমবিন্যাসের ভিন্নতা।

মাধ্যমে আমরা আরএনএ থেকে এর একটি ডিএনএ প্রতিলিপি তৈরি করে সেই ডিএনএকে বহুগুণে বাড়িয়ে ফেলতে পারি। ভাইরাসের নিজের দেহে ডিএনএ না থাকলেও আমরা পরীক্ষাগারে কৃত্রিমভাবে এর আরএনএ থেকে ডিএনএ-স্বরূপ একটি প্রতিলিপি তৈরি করতে পারি। 
দেহের ভেতরে ডিএনএ থেকে আরএনএ তৈরির প্রক্রিয়াটিকে বলে ট্রান্সক্রিপশন এবং এর বিপরীত অর্থাৎ আরএনএ থেকে ডিএনএ তৈরির প্রক্রিয়াটি হলো রিভার্স ট্রান্সক্রিপশন, যা রিভার্স ট্রান্সক্রিপ্টেজ নামক একটি এনজাইমের মাধ্যমে হয়ে থাকে। এই থেকে RT-PCR নামের প্রথম অংশের উৎপত্তি।

দ্বিতীয় অংশ, অর্থাৎ PCR নামের অর্থ জানতে আমাদের পরিচিত হতে হবে পলিমারেজ নামের আরেকটি এনজাইমের সঙ্গে।

কিন্তু এই রিভার্স ট্রান্সক্রিপ্টেজ ও পলিমারেজ এনজাইমগুলো মানুষের আরএনএ ও করোনাভাইরাসের আরএনএর মধ্যে তফাৎ করবে কীভাবে? 

এর জন্য আমাদের ফিরে যেতে হবে আবার জিনোমের বিন্যাসের দিকে। করোনাভাইরাসের সুন্দর crown আকৃতির ছবিটি এখন বেশ পরিচিত সবার কাছে। এদের কিছু বিশেষ প্রোটিন থাকে, যাদের নিউক্লিওক্যাপসিড বলে। এ ছাড়া আরও কিছু প্রোটিন থাকে, যা এই ভাইরাসটির জন্য স্পেসিফিক এবং মানুষের দেহে অনুপস্থিত।
ওই বিশেষ প্রোটিনগুলো আরএনএ জিনোমের যে অংশ থেকে তৈরি হয়, তার দু পাশের কিছু অংশের বিন্যাস বা সিকোয়েন্স বিজ্ঞানীরা এরই মধ্যে বের করে ফেলেছেন ভাইরাসটির জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের মাধ্যমে।
আবার প্রথম দুটি পজিটিভ কিন্তু মানুষের জিনটির উপস্থিতি অনেক সময়ে নেগেটিভ আসতে পারে। সে ক্ষেত্রে ভাইরাসের যেকোনো একটি জিনের জন্য PCR পজিটিভ এলেই নমুনাটি কোভিড-১৯ পজিটিভ-এর সন্দেহের তালিকায় রাখা হয় এবং প্রয়োজনে পুনরায় PCR পরীক্ষা করা যেতে পারে।

মানুষের জিনটির উপস্থিতি অনেক সময় আরএনএ কম পরিমাণে থাকলে নাও আসতে পারে। কিন্তু যদি তিনটি PCR-ই নেগেটিভ আসে অর্থাৎ ডিএনএ বৃদ্ধি হতে না পারে, তাহলে আবার নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাটির পুনরাবৃত্তি করতে হবে। এখানে বলে রাখা উচিত যে, PCR-এর পজিটিভ বা নেগেটিভ ফলাফলের সঙ্গে সঙ্গে রোগীর মধ্যে রোগের কী কী লক্ষণ দেখা গেছে, তার অন্য কোনো অসুখ আছে কি না এবং আনুষঙ্গিক লক্ষণসমূহ বিবেচনা করে, তবেই রোগীর কোভিড-১৯ আছে কি নেই তা নির্ণয় করতে হবে। PCR-এর জন্য নমুনাগুলো তৈরি করার সময় প্রতিটি ধাপে খুব সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। নমুনা সংগ্রহ থেকে শুরু করে মেশিনে বসানোর আগে পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে এ সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। কোনোভাবে একটি নমুনার সঙ্গে আরেকটি নমুনা মিশে গেলে PCR-এ ‘ফলস পজিটিভ’ ফলাফল আসতে পারে। অর্থাৎ, প্রকৃতপক্ষে রোগীর কোভিড-১৯ না থাকলেও রেজাল্ট আসতে পারে যে—তার আছে। আবার নমুনাগুলো সংগ্রহের সময় সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে বা ঠিকমতো সংরক্ষণ না করলে বা জিনে কোনো ধরনের মিউটেশন বা পরিবর্তন থাকলে প্রাইমারটি ঠিকমতো সংযুক্ত হতে পারে না ডিএনএর সঙ্গে। এ ক্ষেত্রেও PCR-এ ‘ফলস নেগেটিভ’ রেজাল্ট আসবে। অর্থাৎ প্রকৃতপক্ষে রোগীর কোভিড-১৯ থাকলেও রেজাল্ট আসতে পারে যে, তার রোগটি নেই; যেটা রোগীর সঠিক চিকিৎসার অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ জন্য এই রোগ নির্ণয়ের প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে অনুসরণ করতে হয়।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি, ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ
নতুন ভাবে লিখেছেন নীরব ইসলাম ৷
সৈজন্য :ProDokan.com

155 thoughts on “কীভাবে শনাক্ত করা হয় করোনাভাইরাস আছে কি নেই

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *